elektronik sigara

সুখবর! সুখবর!! সুখবর!!! হযরতওয়ালা দা.বা. এর গুরত্বপূর্ণ ২ টি নতুন কিতাব বেড়িয়েছে। “নবীজীর (সা.) নামায” এবং “খ্রিষ্টধর্ম কিছু জিজ্ঞাসা ও পর্যালোচনা”।  আজই সংগ্রহ করুন।

হযরতওয়ালা দা.বা. এর কিতাব অনলাইনের মাধ্যমে কিনতে চাইলে ভিজিট করুনঃ www.maktabatunnoor.com

হযরতওয়ালা মুফতী মনসূরুল হক দা.বা. এর সমস্ত কিতাব, বয়ান, প্রবন্ধ, মালফুযাত পেতে   ইসলামী যিন্দেগী  App টি সংগ্রহ করুন।

হযরতওয়ালা মুফতী মনসূরুল হক দা.বা. এর নিজস্ব ওয়েব সাইট www.darsemansoor.com এ ভিজিট করুন।

শরীয়ত কী বলে?

সম্প্রতি কিছু লোক সারা বিশ্বে একইদিনে রোযা শুরু ও একই দিনে ঈদ উদযাপন নিয়ে বেশ বাড়াবাড়ি করছে। আমাদের দেশের কিছু এলাকায় সৌদিআরবকে মডেল বানিয়ে সৌদিআরবের সাথে মিলিয়ে রোযা ও ঈদ পালনও শুরু করেছে। এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য হলো, ‘হানাফী মাযহাবেই সারা বিশ্বে এই দিনে রোযা ও ঈদ পালন করতে বলা হয়েছে’। অথচ কুরআন-সুন্নাহ, ইজমা ও হানাফী মাযহাবের আলোকে এ কথা প্রমাণিত যে, সারা বিশ্বে একদিনে রোযা ও ঈদ শুরু করা শরীয়াতের চাহিদা নয় । বরং প্রত্যেক দূরবর্তী এলাকার লোকজন নিজের এলাকার চাঁদ দেখা অনুযায়ী রোযা ও ঈদ শুরু করাই শরীয়াতের হুকুম। নিম্নে এ ব্যাপারে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও ফিকহে হানাফীর উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলো যাতে বিভ্রান্তির নিরসন হয় এবং সত্য প্রেমিরা পথ খুঁজে পায়।

এ ব্যাপারে আল কুরআনের ভাষ্য:

فمن شهد منكم الشهر فليصمه

‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই রমযান মাস পাবে সে যেন এ সময় অবশ্যই রোযা রাখে।’ (সূরা বাকারা: ১৮৫)

এ আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, যে অঞ্চলের লোকেরা যখন চাঁদ দেখবে তখন তারা রোযা শুরু করবে। এখানে সারা বিশ্বে একই দিনে রোযা শুরু করতে বলা হয়নি।

সূরা বাকারার ১৮৯ নং আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে: يسئلونك عن الاهلة ‘লোকেরা আপনার কাছে নতুন মাসের চাঁদসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে…’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসীর আবুল আলিয়া থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে, সাহাবায়ে কেরাম নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নতুন চাঁদের রহস্য কী? তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা রোযা শুরু করা ও রোযা খতম করার সময় নির্ধারণী হিসেবে নতুন চাঁদ সৃষ্টি করেছেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর : ১/৪৮৮)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো এই আয়াতে চাঁদ বুঝানোর জন্য هلال শব্দের বহুবচন الاهلة শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ নতুন চাঁদসমূহ। এখানে বহুবচন ব্যবহার করাই হয়েছে এ কথা বুঝানোর জন্য যে, মাতলা বা উদয়স্থলের ভিন্নতার ভিত্তিতে রোযা ফরয হওয়ার বিধান জারী হবে। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন হেলাল তথা নতুন চাঁদের ভিত্তিতে ভিন্নভিন্ন উদয়স্থলের লোকদের উপর রোযা ফরয হবে। আর কুরআনের যেখানে শব্দের মধ্যে ব্যাপকতা থাকে তা শানে নুযূল তথা অবতীর্ণের উৎস মূলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। (বিস্তারিত জানতে দেখুন মাবাহেস ফী উলূমিল কুরআন পৃ.৭৮ শায়েখ মান্না কাত্তা)

এ ব্যাপারে সুন্নাহর ভাষ্য:

১. হযরত আবূ হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোযা শুরু কর, আবার চাঁদ দেখে ইফতার (ঈদুল ফিতর) করো, যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে শাবান মাস ত্রিশদিন পূর্ণ করো।’ (সহীহ বুখারী হা.নং১০৯০, মুসলিম হা.নং ২৫৬৭)

এই হাদীস দ্বারা শুধু এতটুকু বুঝে আসে যে, চাঁদ দেখে রোযা রাখতে হবে, আবার চাঁদ দেখেই রোযা ছাড়তে হবে। কাছের এলাকা বা শহর থেকে যদি চাঁদ দেখার সংবাদ আসে তা গ্রহণ করা যাবে কিনা? এ ব্যাপারে এই হাদীসে কোনো নির্দেশনা নেই। কিন্তু অপর এক হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যদি নিকটবর্তী কোনো এলাকা থেকে চাঁদ দেখার সংবাদ আসে তাহলে নিজেরা চাঁদ না দেখলেও তা গ্রহণ করা হবে।

যেমন, হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, গ্রামে বসবাসকারী জনৈক ব্যক্তি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললেন, আমি গত রাতে রমযানের নতুন চাঁদ দেখেছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি সাক্ষ্যপ্রদান কর যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই? লোকটি বলল হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি সাক্ষ্য প্রদান কর যে, আমি আল্লাহর রাসূল? লোকটি উত্তর দিল হ্যাঁ। অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেলাল রাযি.কে লক্ষ্য করে বললেন, হে বেলাল! তুমি লোকদেরকে জানিয়ে দাও তারা যেন আগামী দিন থেকে রোযা রাখা শুরু করে। (আবূ দাঊদ হা.নং ৬৯১, নাসায়ী হা.নং২১১২)

বর্ণিত হাদীসে আগত ব্যক্তি শহরের বাহির থেকে এসে চাঁদের সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা গ্রহণও করেছেন। এর দ্বারা এ কথা স্পষ্ট বুঝে আসে যে, নিজেরা চাঁদ না দেখলেও কাছের এলাকার বা শহরের কারো দ্বারা চাঁদ দেখা প্রামাণিত হলেও রোযা রাখা ফরয হয়ে যাবে। কিন্তু দূরবর্তী এলাকার চাঁদ দেখার সংবাদ এলে বা সেখানের আমীর কর্তৃক চাঁদ প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে ফয়সালার খবর এলে তা গ্রহণ করা হবে কিনা? সে ব্যাপারে অপর একটি হাদীসে নির্দেশনা পাওয়া যায়।

‘কুরাইব রহ. থেকে বর্ণিত, উম্মুল ফযল বিনতে হারেস তাকে সিরিয়ায় হযরত মুআবিয়া রাযি. এর কাছে পাঠালেন (কুরাইব বলেন) আমি সিরিয়ায় পৌঁছলাম এবং প্রয়োজনীয় কাজ সমাধা করলাম। আমি সিরিয়ায় থাকা অবস্থায় জুমআর রাতে রমযানের নতুন চাঁদ দেখেছি। এরপর রমযানের শেষভাগে আমি মদীনায় ফিরে এলাম। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস আমার নিকট কিছু প্রশ্ন করলেন এবং নতুন চাঁদ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। এরপর তিনি বললেন, তোমরা কোন দিন নতুন চাঁদ দেখেছ? আমি বললাম জুমআর রাতে চাঁদ দেখেছি। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, তুমি কি নিজে দেখেছ? আমি বললাম হ্যাঁ, আর লোকেরাও দেখেছে এবং তারা রোযাও রেখেছে, মুআবিয়া রাযি.ও রোযা রেখেছেন। তখন ইবনে আব্বাস রাযি. বললেন, আমরা কিন্তু শনিবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছি এবং সেই হিসাবেই আমরা শেষ পর্যন্ত রোযা থাকবো, অর্থাৎ চাঁদ না দেখা গেলে ত্রিশ দিন পূর্ণ করব অথবা ২৯ তারিখে নিজেরাই চাঁদ দেখব। আমি বললাম, মুআবিয়া রাযি. এর চাঁদ দেখা ও রোযা রাখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়? তিনি বললেন, না। কেননা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহীহ মুসলিম হা.নং১০৮৭, মুসনাদে আহমাদ হা.নং২৭৮৯, আবূ দাঊদ হা.নং২৩৩২, তিরমিযী হা.নং ৬৯৩)

এই হাদীস থেকে পরিষ্কার বুঝে আসছে যে, যদি চাঁদ দেখার স্থান দূরবর্তী হয়, তাহলে সেখানের চাঁদ দেখা অন্যদের জন্য যথেষ্ট হবে না। কারণ কুরাইব বিন আবী মুসলিম (মৃত: ৯৮হি.) একজন তাবেঈ ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি এবং ইবনে আব্বাস রাযি. এর অতিঘনিষ্ট জন। আর ইবনে আব্বাস রাযি. এর নিকট রমযান সম্পর্কে এক ব্যক্তির সংবাদই যথেষ্ট। তিনি নিজেই এ সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করেছেন যা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। আর কুরাইব শুধু নিজের চাঁদ দেখার সংবাদ দেননি বরং তখনকার আমীরুল মুমিনীন হযরত মুআবিয়া রাযি. এর কাছে চাঁদ দেখা প্রামাণিত ও কার্যকর হওয়ার সংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং তার সংবাদের ভিত্তিতে ইবনে আব্বাস রাযি. এর কাছে চাঁদ দেখার এই সংবাদ গ্রহণ করতে কোনো বাধা ছিল না। এতদসত্ত্বেও ইবনে আব্বাসে রযি. এর নিকট সিরিয়া দূরবর্তী এলাকা গণ্য হওয়ায় তিনি সে সংবাদ গ্রহণ করলেন না বরং বলে দিলেন : هكذا امرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم  ‘নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এমনই আদেশ করেছেন’

এ কথা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, ইবনে আব্বাস রাযি.এর মাযহাব এটাই ছিল যে, দূরবর্তী এলাকায় চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোযা ফরয হবে না। হতে পারে ইবনে আব্বাস রাযি. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী ‘চাঁদ দেখে রোযা রাখো ও চাঁদ দেখে রোযা ছাড়ো’ এর উপর তার মাযহাবের ভিত্তি রেখেছেন। অথবা সরাসরি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এমন আদেশে আদিষ্ট হয়ে এ কথা বলেছেন।

উম্মতের ইজমা: দূরবর্তী এলাকার চাঁদ দেখা গ্রহণযোগ্য না হওয়ার ব্যাপারে ইজমা তথা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ইমাম আবূ বকর আল-জাসসাস আহকামুল কুরআনে লিখেন: ‘আর এ ব্যাপারে সকলেই ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, দূরবর্তী অঞ্চলের প্রত্যেক শহরের জন্য তাদের চাঁদ দেখা ধর্তব্য হবে অন্যের দেখার অপেক্ষা করা ছাড়াই।’ (আহকামুল কুরআন:১/৩০৫)

ইমাম জাসসাস রহ. এখানে ইজমার কথা উল্লেখ করেছেন যে, দূরবর্তী অঞ্চলের জন্য তাদের নিজেদের চাঁদ দেখা ধর্তব্য। যদিও এর ব্যাখ্যায় তিনি ভিন্ন ক্ষেত্রের কথা বলেছেন। কিন্তু মূল বিষয়টির ব্যাপারে ইজমার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. মুআত্তা মালেকের ভাষ্য গ্রন্থ ‘আল ইসতিযকার’-এ লিখেছেন: ‘এ ব্যাপারে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, দূরবর্তী শহর যেমন খোরাসান থেকে স্পেন, এমন ক্ষেত্রে এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না। তদ্রূপ প্রত্যেক শহরবাসীর জন্য তাদের চাঁদ দেখা ধর্তব্য, তবে বড় শহর হলে বা চাঁদের উদয়স্থল কাছাকাছি হলে এমন শহরের কথা ভিন্ন। অর্থাৎ সে ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী এলাকার চাঁদ দেখা ধর্তব্য হবে। (ইসতিযকার:৩/২৮৩)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ইমাম ইবনে আব্দুল বারের পূর্বোক্ত ইজমার কথা উল্লেখ করে দ্বিমত পোষণ করেননি। তিনি লিখেছেন: ‘ ইবনে আব্দুল বার উল্লেখ করেছেন, এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য গ্রহণযোগ্য হবে কিনা? এই মতানৈক্য ঐ সব এলাকার ক্ষেত্রে যেসব এলাকার চাঁদের উদয়স্থল এক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর যেসব এলাকা দূরবর্তী যেমন খোরাসান ও স্পেন এসব এলাকার ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য নেই যে, এমন দূরবর্তী এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য ধর্তব্য নয়।’ এ কথা উল্লেখ করার কিছু পরেই তিনি এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের মাযহাব বর্ণনা করে লিখেছেন: ‘দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা ধর্তব্য না হওয়ার যে ইজমা ইবনে আব্দুল বার বর্ণনা করেছেন তা ইমাম আহমাদ রহ. এর দলীলের খেলাফ না।’ (মাজমূআতুল ফাতাওয়া : ২৫/১০৩, ১৩/৬২)

হাফেজ ইবনে হাজার রহ. ফাতহুল বারীতে লিখেছেন: ‘ইবনে আব্দুল বার রহ. দূরবর্তী এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না মর্মে ইজমা নকল করেছেন। তিনি বলেছেন, উলামায়ে উম্মত এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, দূরবর্তী এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য যথেষ্ট নয়।’ (ফাতহুল বারী: ৪/১৫৫)

ইমাম ইবনে রুশদ বেদায়াতুল মুজতাহিদ কিতাবে লিখেছেন: ‘এ ব্যাপারে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, দূর দেশের ক্ষেত্রে এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য ধর্তব্য হবে না। যেমন: স্পেন ও হেজাজ।’ (বেদায়াতুল মুজতাহিদ নেহায়াতুল মুকতাসিদ:২/৫০)

আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী মাআরেফুস সুনানে লিখেছেন: ‘শাইখ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বলেন, ইমাম যায়লায়ীর কথার উপর আমার সিদ্ধান্ত স্থির ছিল। পরে কাওয়ায়েদে ইবনে রুশদ কিতাবে এ ব্যাপারে ইজমার বর্ণনা পেয়েছি যে, দূরবর্তী স্থান হলে উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য হবে। আর কতটুকু দূরকে দূর বলে ধরা হবে তা অবস্থার শিকার ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিবে, তার নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারিত নেই।’ (মাআরিফুস সুনান: ৫/৩৪০)

তবে এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য মত হলো, যে দুই দেশে বা এলাকার চাঁদ দেখার তারিখ সব সময় একই হয় সে দুই দেশকে নিকটবর্তী এলাকা গণ্য করা হবে। যে সব এলাকার মধ্যে চাঁদ দেখার ব্যাপারে সাধারণত একদিন বা ততোধিক দিনের পার্থক্য থাকে সেসব এলাকাকে দূরবর্তী শহর বা এলাকা গণ্য করা হবে। (ফাতহুল মুলহিম: ৩/১১৩, কিতাবুল মাজমূ : ৬/১৮৩)

আরব বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলেম ড. ওয়াহবা আয্যুহায়লী ‘আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লতুহু’ তে ও ইবনে রুশদের অনুরূপ ইজমা নকল করেছেন। (আল ফিকহুল ইসলামী : ৩/১৬৫৮)

পূর্বের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হলো যে, দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য নয়, এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং ইজমার কথা যখন বর্ণনা হয়েছে এবং ইবনে তাইমিয়া, ইবনে হাজার ও ইমাম কাশ্মীরীর মত বিদগ্ধ উলামায়ে কেরামও ঐ ইজমাকে অস্বীকার করেননি বরং ইবনে তাইমিয়া তো বিভিন্ন স্থানে বারবার এ কথা বলেছেন যে, এটা ইবনে আব্দুল বারের বর্ণনা করা ইজমার খেলাফ না। সুতরাং বর্ণিত ইজমাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া প্রথম যুগের ইমামদের থেকে বর্ণিত মতামত হয়তো একাধিক রয়েছে অথবা মুজমাল (ব্যাখ্যা সাপেক্ষ)। সুতরাং সে মতের কারণে ইজমার উপর কোনো প্রভাব পড়বে না। (মাআরেফুস সুনান:৫/৩৪৩)

যদিও মাসআলাটি মূলত মুজতাহিদ ফীহ হওয়ায় পরবর্তী উলামায়ে কেরাম মতানৈক্য ও ভিন্নভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন।

হানাফী মাযহাব: উদয়স্থলের বিভিন্নতার সূরতে চাঁদ প্রমাণিত হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে আসহাবে মাযহাব অর্থাৎ ইমাম আবূ হানিফা, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ. থেকে কোনো মতামত আমরা পাইনি। আর পরবর্তীদের মধ্যে দুই ধরনের মতামত পাওয়া যায়।

ক. ইখতিলাফে মাতালে গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ চন্দ্রের উদয়স্থলের পার্থক্য ধর্তব্য হবে। সুতরাং এক দূরবর্তী দেশের চাঁদ দেখা অন্য দূরবর্তী দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না। হ্যাঁ, নিকটবর্তী দেশ হলে এক দেশের চাঁদ দেখা অন্য দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে।

খ. ইখতিলাফে মাতালে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ চন্দ্রের উদস্থলের পার্থক্য ধর্তব্য নয়। সুতরাং এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে অন্য অঞ্চলের জন্য তা গ্রহণযোগ্য হবে। এ মতটির প্রয়োগস্থল নিকটবর্তী এলাকা না দূরবর্তী এলাকা তা অস্পষ্ট এবং ব্যাখ্যাহীন।

দ্বিতীয় মতের আলোচনা ও তার ব্যাখ্যা পরে উল্লেখ করা হবে, প্রথমে প্রথম মতের স্বপক্ষে যেসব হানাফী উলামায়ে কেরাম মতামত ব্যক্ত করেছেন তাদের নাম ও কিতাবের হাওয়ালা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১. ইমাম হুসামুদ্দীন শহীদ ‘আলফাতাওয়াল কুবরা’ (পৃ. ১৬)

২. ফকীহ আবুল ফাতাহ যহীরুদ্দীন আল ওয়ালওয়ালেজী ‘আল ফাতাওয়া আলওয়ালওয়ালিজিয়্যাহ (১/২৩৬) তে,

৩. আল্লামা কাসানী ‘বাদায়েউস সানায়ে’ (২/৫৭৯)

৪. আল্লামা আইনী ‘শরহুল আইনি আলা কানযিদ্দাকায়েক’ (১/১৩৮)

৫. ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রশীদ কিরমানী ‘জাওয়াহেরুল ফাতাওয়া’ (১/৩২ : ৩৩)

৬. মোল্লা আলী কারী ‘ফাতহু বাবিল ইনায়া’ (১/৫৬৫)

৭. ফকীহ্ আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ শায়খী যাদা ‘মাজমাউল আনহুর’ (১/৩৫৩)

৮. ইমাম আব্দুল হাই লাখনাবী ‘মাজমূআতুল ফাতাওয়া’-এর রুয়াতুল হেলাল অধ্যায় (উর্দূ ১/৩৪৪)

৯. ফকীহ আলী ইবনে উসমান ‘আল ফাতাওয়াস সিরাজিয়্যাহ’ (৩১পৃ)

১০. ইমাম ফখরুদ্দীন যাইলায়ী ‘তাবয়ীনুল হাকায়েক’ (২/১৬৪)

১১. আল্লামা শাব্বির আহমাদ উসমানী ‘ফাতহুল মুলহিম’ (৩/১১৩)

১২. মুফতী শফী রহ.  ‘জাওয়াহেরুল ফিকহ’ (৩/৪৩৯)

১৩. আল্লামা মুসিলী ‘আল ইখতিয়ার’ কিতাবে ‘ফাতাওয়া হুসামিয়া’ থেকে উক্ত মত বর্ণনা করেছেন। এবং তার নিজের রুজহানও সেদিকে হওয়া বুঝে আসে।

১৪. মক্কা-মদীনার উলামায়ে কেরামের ফাতাওয়াও অনুরূপ। (ফাতাওয়া উলামাউল বালাদিল হারাম পৃ.৮৮৭)

১৫. ‘মাজালিসে তাহকীকাতে শরইয়্যাহ নদওয়াতুল উলামা’-এর সিদ্ধান্তও এরূপ। (নাফায়িসুল ফিকহ:৩/১৪১)

আল্লামা ইবনুল হুমাম পূর্বে উল্লেখিত কুরাইব রহ. থেকে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করার পর বলেন: ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ হাদীসের অনুসরণ অধিকতর শ্রেয়, কারণ দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা গ্রহণযোগ্য কিনা এ ব্যাপারে এ হাদীসটি সুস্পষ্ট বর্ণনা। তাছাড়া এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, প্রত্যেক অঞ্চলের লোকদেরকে তাদের নিজেদের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রোযা রাখার আদেশ করা হয়েছে। (ফাতহুল কদীর: ২/৩১৯)

আল্লামা কাসানী রহ. লিখেছেন: (এক শহরবাসী চাঁদ দেখে ত্রিশ রোযা পুরা করার সূরতে অপর শরহবাসী উনত্রিশ রোযা রাখলে একটি রোযা কাযা করবে।) ‘এটা সে ক্ষেত্রে যখন দুই শহর কাছাকাছি হয়, উদয়স্থলের পার্থক্য না হয়। আর যদি অপর শহর দূরে হয়, তাহলে এক শহরবাসীর জন্য অন্য শহরের হুকুম আবশ্যক হবে না। কারণ শহর বা অঞ্চলের মাঝে অনেক দূরত্ব হলে উদয়স্থলও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। সুতরাং এমন ক্ষেত্রে প্রত্যেক শহরবাসীর জন্য তাদের উদয়স্থলই ধর্তব্য হবে অন্যদেরটা নয়। (বাদায়েউস সানায়ে: ২/৫৭৯)

আল্লামা ফখরুদ্দীন যায়লায়ী লিখেছেন: ‘দলীল প্রমাণের বিচারে সর্বাধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ মত হলো উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য হওয়া। কারণ প্রত্যেক এলাকাবাসী তাদের অবস্থা হিসাবে সম্বোধিত বা দায়িত্ব প্রাপ্ত।’ (তাবয়ীনুল হাকায়েক: ২/১৬৪)

মোল্লা আলী কারী রহ.  লিখেছেন: ‘ দলীল প্রমাণের বিচারে সর্বাধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ মত হলো উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য হওয়া।’ (ফাতাহু বাবিল ইনায়াহ: ১/৫৬৭)

‘ফাতাওয়া উলামায়ে বালাদে হারাম’ গ্রন্থে উদয়স্থলের বিভিন্নতা গ্রহণ করা হবে মতটি উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে: ‘আর এই মতটিই শব্দ ও সঠিক গবেষণার বিচারে শক্তিশালী’ (ফাতাওয়া উলামায়ে বালাদে হারাম পৃ.৮৮৯)

আবুল ফাতাহ ওয়াল ওয়ালেজী লিখেছেন : ‘দুই দেশের উদয়স্থল যদি ভিন্ন হয়, তাহলে এক দেশের হুকুম অন্য দেশের জন্য আবশ্যক হবে না।’ (আল ফাতাওয়াল ওয়ালওয়ালেজিয়াহ : ১/৩২৬)

দ্বিতীয় মতের বিচার বিশ্লেষণ : যেসব হানাফী উলামায়ে কেরাম দ্বিতীয় মত উল্লেখ করেছেন তাদের নাম ও কিতাবের নাম:

১. সাহেবে খুলাসাতুল ফাতাওয়া ‘খুলাসাতুল ফাতাওয়া’ (১/২৪৯)

২. আল্লামা কাযী খান ‘ফাতাওয়া কাযীখান’ (১/১৯৮)

৩. ফকীহ আলম উবনুল আলা ‘তাতারখানিয়া’ (৩/৩৬৫)

৪. ইবনে নুজাইম ‘বাহরুর রায়েক’ (২/৪৭১)

৫. আল্লামা বায্যাযী ‘ফাতাওয়া বাযযায়িা’ (১/৮৬)

৬. উমর ইবনে ইবরাহীম ‘নাহরুল ফায়েক’ (২/১৪)

৭. সাহেবে ফাতাওয়া হিন্দিয়া ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ (১/১৯৮)

৮. আল্লামা শামী ‘ফাতাওয়ায়ে শামী’ (২/৩৯৩)

৯. আশরাফ আলী থানভী রহ.  ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ (২/১০৭)

১০. এবং ফাতাওয়ায়ে দারুল উলূম সহ আরো বিভিন্ন কিতাবে এ কথা বলা হয়েছে যে, উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য না, এটাই জাহেরুর রেওয়ায়াহ। সুতরাং এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে অন্য অঞ্চলেও চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে। নিকটবর্তী অঞ্চল ও দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

উল্লেখ্য যে, এ ব্যাপারটি কারো কাছে অস্পষ্ট থাকার কথা নয় যে, ‘উদয়স্থলের বিভিন্নতা সত্ত্বেও এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে কিনা’ এ বিষয়টি মুজতাহিদ ফীহ এবং মুখতালাফ ফীহ ও বটে। ‘ফাতাওয়া আল লাজনাতুত দায়িমায়’ আব্দুল আজীজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায, আব্দুররায্যাক আফীফী এবং আব্দুল্লাহ বিন মুনি স্বাক্ষরিত ফাতাওয়াতে আছে: ‘উদয়স্থলের বিভিন্নতা সত্ত্বেও এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য ধর্তব্য না হওয়ার মাসআলাটি মাসায়েলে নাজরিয়্যাহ, এতে ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে। আর এ মাসআলার ক্ষেত্রে মতের ভিন্নতা হয়েছে তাদের যাদের ইলম ও দ্বীনের ক্ষেত্রে আলাদা মর্যাদা রয়েছে। আর এটা ঐ সকল মাসায়েলের একটি যাতে ইজতিহাদ সঠিক হলে ডাবল সাওয়াব, আর ভুল হলে অর্ধেক সাওয়াব।’ (প্রাগুক্ত : ১০/১০২)

সুতরাং এ ক্ষেত্রে মুজতাহিদ ইজতিহাদের যেমন সুযোগ রয়েছে তেমনি পরবর্তী ফকীহদের জন্য শর্ত সাপেক্ষে কোনো একটি মত গ্রহণ করার অবকাশ রয়েছে। আর মূলত এ মাসআলাটি তারজীহ বা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমল করার মত একটি মাসআলা। সুতরাং কোনো ‘আসহাবে তারজীহ’ যেকোনো মতকে দলীলের ভিত্তিতে তারজীহ অর্থাৎ প্রাধান্য দিতে পারেন।

শেষোক্ত উলামায়ে আহনাফের ইবারাতের বর্ণনা থেকে এ কথা প্রতিয়মাণ হয় যে, তারা উদয়স্থলের বিভিন্নতা সত্ত্বেও এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য গ্রহণযোগ্য হওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং এমতটিকে তারা জাহেরুল মাযহাব বলে দাবি করেছেন, আর জাহেরুল মাযহাব হওয়ার কারণেই এই মতটিকে তারা অন্য মতটির উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় হলো এই মতটি আসলেই জাহেরুল মাযহাব বা জাহেরুর রেওয়ায়াহ কিনা?

জাহেরুর রেওয়ায়াহ বা জাহেরুল মাযহাবের আলোচনাঃ

শাইখুল ইসলাম আল্লামা তাকী উসমানী দা.বা. লিখেছেন : ‘জাহেরুর রেওয়ায়হ বলা হয় ঐ সকল মাসায়েলকে যেগুলো ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর কিতাব মাবসূত, যিয়াদাত, জামেয়ে সগীর, সিয়ারে সগীর, জামেয়ে কাবীর, ও সিয়ারে কাবীরে পাওয়া যায়। (উসূলুল ইফতা:১১৩, উকূদু রসমিল মুফতী:৭৩)

ইখতেলাফুল মাতালে মু‘তাবার না। অর্থাৎ উদয়স্থলের বিভিন্নতা সত্ত্বেও এক স্থানের চাঁদ দেখা অন্য স্থানের জন্য ধর্তব্য হবে, এমন কোনো ফায়সালা আমরা জাহেরুর রেওয়ায়াহতে পাইনি (জাহেরুর রেওয়ায়াহ এর প্রায় সব কিতাবই খুঁজে দেখা হয়েছে)। ইমাম সারাখসী রহ. এর ‘আল মাবসূত’ যা জাহেরুর রেওয়ায়াহ’ এর মাসআলা-মাসায়েলের সংক্ষিপ্ত সংকলন এবং ‘কাফী’র ব্যাখ্যা গ্রন্থ সেখানেও এরূপ কোনো কথা পাওয়া যায়নি। এমনকি নাদিরুর রেওয়ায়াতেও এমন কথা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি।

সুতরাং হানাফীদের কোনো গ্রন্থে ‘ইখতিলাফে মাতালে মু‘তাবার না’ এটাকে জাহেরুর রেওয়ায়াহ বলা এবং এ শুধু এ কারণে এই মতকে তারজীহ দেওয়ার ব্যাপারে নতুন করে ভেবে দেখা উচিত। অনেক সময় এমন হয় যে, কোনো একটি মাসআলা কারো দিকে নিসবত করা হয়, পরবর্তীরাও তার অনুসরণ করে নিজের কিতাবে তা উল্লেখ করে দেয়। কিন্তু আসল কিতাব পুনরায় নিরীক্ষণ করলে তা যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সেভাবে পাওয়া যায় না। আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহ.  শরহু উকূদি রসমিল মুফতীতে এ বিষয়ে অনেকগুলো দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। (শরহু উকূদি রসমিল মুফতী পৃ.৫৮)

এই মাসআলাটির উৎস:

নাদিরুর রেওয়ায়াহতে একটি মাসআলা পাওয়া যায় যার থেকে চাঁদের মাসআলাটি মুসতান্বাত বা বের হতে পারে। আহকামুল কুরআনসহ কয়েকটি কিতাবে তার বর্ণনা রয়েছে।

ইমাম জাসসাস রহ.  বলেন: ‘বিশর বিন ওয়ালীদ আবূ ইউসুফ রহ. থেকে এবং হিশাম মুহাম্মাদ রাহ., থেকে আমাদের আসহাবদের কারো মতোবিরোধ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন যে, যখন কোনো শরহবাসী চাঁদ দেখে উনত্রিশ দিন রোযা রাখে, আর ঐ শহরে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি রোযা রাখলো না, তার হুকুম হলো সুস্থ হওয়ার পর সে উনত্রিশটি রোযাই কাযা করবে। আর যদি কোনো অঞ্চলের লোক চাঁদ দেখে ত্রিশটি রোযা রাখে আর অপর অঞ্চলের লোকেরা চাঁদ দেখে উনত্রিশটি রোযা রাখে তাহলে পূর্বোক্ত মাসআলা থেকে বুঝে আসে যে, যারা উনত্রিশটি রোযা রেখেছে তাদের জন্য একটি রোযা কাযা করা জরুরী। আর ঐ শহরের অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ত্রিশটি রোযা কাযা করতে হবে। (আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস : ১/৩০৩)

ইমাম জাসসাস আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ. থেকে যে দুইটি মাসআলা বর্ণনা করেছেন সম্ভবত তার দ্বিতীয়টি থেকে ইখতেলাফে মাতালের মাসআলাটি ছাবেত করা হয়েছে। অর্থাৎ এক শহরবাসী উনত্রিশ দিন রোযা রাখল আর অপর শহরবাসী চাঁদ দেখে ত্রিশ দিন রোযা রাখল, তাহলে যে শহরবাসী উনত্রিশ দিন রোযা রেখেছে, তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা একটি রোযা কাযা করবে। সুতরাং এর দ্বারা বুঝা যায় যে, যে শহরবাসী উনত্রিশ দিন রোযা রেখেছে তাদের উপর ঐ শহরবাসী যারা চাঁদ দেখে ত্রিশ দিন রোযা রেখেছে তাদের চাঁদ দেখার কারণেই একটি রোযা কাযা করতে হবে। অতএব, এর দ্বারা বুঝা গেল অপর শহরবাসীর চাঁদ দেখা ধর্তব্য। ফলে ইখতিলাফে মাতালে মু‘তাবার নয় সাব্যস্ত হলো অর্থাৎ উদয়স্থলের পার্থক্য গ্রহণযোগ্য নয়।

এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:

১. দ্বিতীয় মাসআলার ব্যাপারে ইমাম জাসসাস বলেছেন: ‘পূর্বোক্ত মাসআলা থেকে বুঝা যায় যে যারা উনত্রিশটি রোযা রেখেছে তারা একটি রোযা কাযা করবে।’ এর দ্বারা বুঝা গেল দ্বিতীয় মাসআলাটি প্রথম মাসআলা থেকে ইস্তিম্বাত বা বের করা হয়েছে, এটি মানসূস আলাইহি কোনো মাসআলা না।

২. বর্ণিত মাসআলায় দুই শহরের উদয়স্থল ভিন্ন ভিন্ন নাকি এক, এ ব্যাপারে কোনো কিছুই উল্লেখ নাই। তাই এ মাসআলা থেকে ইখতিলাফে মাতালে মু‘তাবার না, এ কথা প্রমাণ করা অসম্ভব।

৩. তাছাড়া এ মাসআলাটি ‘মুহীতে বুরহানী’ এবং ‘তাতারখানিয়াতে’ ‘মুনতাকা’-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করা হয়েছে। আর মুনাতাকার ব্যাপারে কাশফুযযুনূর এর লেখক লিখেছেন: ‘আল মুনতাকা ফী ফুরূইল হানাফিয়্যাহ হাকেম শহীদ রহ. এর লেখা। এতে মাযহাবের নাওয়াদিরুর রেওয়ায়হ সন্নিবেশিত হয়েছে।’ (কাশফুয যুনূন:১৮৫১)

অতএব, যে বর্ণনার মধ্যে মাতালে বা উদয়স্থলের ভিন্নতা সত্ত্বেও চাঁদ প্রমাণিত হওয়ার কোনো আলোচনাই নেই এবং যেটা নাদিরুর রেওয়ায়াহ সন্নিবেশিত গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত সেটাকে জাহেরুর রেওয়ায়াহ বলা কি করে বৈধ হতে পারে?

তাই আমরা বলতে পারি যে, ইখতেলাফে মাতালে মু‘তাবার না, এই মাসআলাটিকে জাহেরুর রেওয়ায়াহ দাবি করে, জাহেরুর রেওয়ায়াহ হওয়ার কারণেই তারজীহ বা প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, অথচ আমাদের আলোচনা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হলো যে, এই মতটিকে জাহেরুর রেওয়ায়াহ দাবি করার কোনো কারণ নেই। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আসহাবে মাযহাবের মতের ব্যাপারে আমরা তাই বলতে চাই যা ইউসুফ বান্নুরী রহ. বলেছেন। তিনি বলেন: ‘প্রকাশ থাকে যে, মাযহাবের উলামাদের থেকে শুধু এতটুকু বর্ণনা পাওয়া যায় যে, উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য না। কাছের এলাকার বা দূরের এলাকার অথবা অন্যকোনো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়া তাদের থেকে এই এজমালী কথা পাওয়া যায়… এ দিকে আমরা যখন জানতে পারলাম যে, দূরবর্তী এলাকার ক্ষেত্রে উদয়স্থলের পার্থক্য ধর্তব্য হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সুতরাং আইম্মা কেরামের মুতলাক (ব্যাখ্যা ছাড়া) কথাকে, নিকটবর্তী অঞ্চলের ক্ষেত্রে উদয়স্থলের পার্থক্য ধর্তব্য না, এরূপ শর্তের সাথে শর্তযুক্ত করা আবশ্যক। আমাদের শায়েখ আল্লামা কাশ্মীরী এটাই বলতে চেয়েছেন।’ (মাআরিফুস সুনান:৫/৩৪১:৪২)

এখন আর হানাফীদের দুই প্রকার মতের ক্ষেত্রে কোনো সংঘর্ষ থাকল না। শুধু এতটুকু পার্থক্য থাকলো যে, একটি মত বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে, আরেকটি মত যেটির আলোচনা আমরা শেষে করেছি সেটি অস্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় মতটির ব্যাখ্যা করার পর প্রথম মতটির সাথে এর কোনো সংঘর্ষ বাকি থাকে না।

প্রিয় পাঠক! আশা করি আমাদের সংক্ষিপ্ত এই আলোচনা পড়ার পর আপনার বুঝতে বাকী নেই যে, নিকটবর্তী এলাকার কোনো এলাকায় চাঁদ প্রমাণিত হলে তাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকায় এই চাঁদ দেখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তবে দূরবর্তী এলাকার হুকুম ভিন্ন। দূরবর্তী এলাকার ক্ষেত্রে এক অঞ্চল বা দেশের চাঁদ দেখা অন্য দেশের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং প্রত্যেক দূরবর্তী এলাকা নিজেদের চাঁদ দেখা অনুযায়ী রোযা ও ঈদ পালন করবে। উল্লেখিত মাসআলাটি নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের একক সিদ্ধান্ত নয়। বরং মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত এটিই। সুতরাং এ মাসআলার ব্যাপারে আর কোনো দ্বিধা-দ্বন্ধের অবকাশ নাই। চৌদ্দশত বছর ধরে উম্মতের আমল যেভাবে চলে আসছে তাই সহীহ এবং দলীল প্রমাণ সমর্থিত আর ইজমাও এর উপর প্রতিষ্ঠিত। এই মাসআলার বিরোধিতা করে নতুন কোনো আমল চালু করা মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানো ও কুরআন-সুন্নাহের বিরোধিতার নামান্তর।

সুতরাং আমাদের দেশের গুটিকয়েক বিদআতী ও ফেতনা সৃষ্টিকারী নামধারী আলেমদের কথা শুনে ও তাদের লেখা পড়ে বিভ্রান্ত হবেন না। তাদের কথা অনুযায়ী সাউদী আরবের সাথে মিলিয়ে রোযা ও ঈদ পালন করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং হেদায়াতের উপর কায়েম দায়েম রাখুন। আমীন।