elektronik sigara

হযরতওয়ালা মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা.বা. এর সমস্ত কিতাব, বয়ান, প্রবন্ধ, মালফুযাত পেতে   ইসলামী যিন্দেগী  App টি সংগ্রহ করুন।

প্রতিদিন আমল করার জন্য “দৈনন্দিন আমল ও দু‘আসমূহ” নামক একটি গুরত্বপূর্ণ কিতাব আপলোড করা হয়েছে।

ইনশাআল্লাহ জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসায় দাওয়াতুল হকের মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ঈসায়ী।

সুখবর! সুখবর!! সুখবর!!! হযরতওয়ালা দা.বা. এর গুরত্বপূর্ণ ২ টি নতুন কিতাব বেরিয়েছে। “নবীজীর (সা.) নামায” এবং “খ্রিষ্টধর্ম কিছু জিজ্ঞাসা ও পর্যালোচনা”।  আজই সংগ্রহ করুন।

হযরতওয়ালা মুফতী মনসূরুল হক সাহেব দা.বা. এর নিজস্ব ওয়েব সাইট www.darsemansoor.com এ ভিজিট করুন।

হযরত ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রহ. এর উস্তাদ আবু বকর ইবনে শাইবা রহ. এর কিতাব আল মুসান্নাফ পৃঃ ২/১৬৬, হাদীস নং ৭৬৯১, এছাড়া হাদীসের প্রসিদ্ধ কিতাব বাইহাকী পৃঃ ২/৬৯৮-৬৯৯, হাদীস নং ৪৬১৫, ৪৬১৭, তাবারানী পৃঃ ১১/২৬১, হাদীস নং ৭৭৩৩, “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীসের রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আমল দ্বারা ২০ রাকা‘আত তারাবীহ নামায প্রমাণিত।” (আন-নুকাত আলা মুকাদ্দামাতি ইবনিস সালাহ-১/৩৯০, আন-নুকাত আলা কিতাবি ইবনিস সালাহ-১/৪৯৪)

দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর রাযি. তার খেলাফত আমলে মসজিদে নববীর মধ্যে তারাবীহ নামাযের অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জামা‘আতকে একত্র করে হযরত উবাই বিন কাআব রাযি. এর ইমামতীতে ২০ রাকা‘আত তারাবীহ নামাযের হুকুম দিয়েছিলেন। সকল সাহাবায়ে কেরাম রাযি. তাঁর সমর্থন করেছিলেন। তারাবীহ নামায যদি নবী আলাইহিস সালাম থেকে ২০ রাকা‘আত প্রমাণিত না হতো তাহলে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. অবশ্যই আপত্তি তুলতেন (বাইহাকী পৃঃ ২/৪৯৭, হাদীস নং ৪৬১৭,৪৬২০, ৪৬২১, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক পৃঃ ৪/২৬১, হাদীস নং ৭৭৩২, বুখারী পৃঃ ১/৪৭৪, হাদীস নং ২০১০, মাজামাউ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া-২৩/১১২-১১৩ বাদায়েউস সানায়ে-১/৬৪৪)

তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান গনী রাযি., চতুর্থ খলীফা হযরত আলী রাযি. সহ সাহাবায়ে কিরামের রাযি. ঐক্যমতে, উম্মাতে মুসলিমার ১৪০০ শত বছর পর্যন্ত ধারাবাহিক আমল তারাবীহ নামায বিশ রাকা‘আত চলে আসছে। যা আজ পর্যন্ত বাইতুল্লাহ শরীফ ও মসজিদে নববীতে চালু আছে (বাইহাকী কুবরা পৃঃ ২/৪৯৬, হাদীস নং ৪৬১৭, পৃঃ ২/৪৯৭, হাদীস নং ৪৬২০, ৪৬২১, শরহুল মুহাজ্জাব পৃঃ ৩/৩৬৩-৩৬৪)

ইমাম আ’জম আবু হানীফা রহ., ইমাম মালেক রহ., ইমাম শাফেয়ী রহ., ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. যারা প্রত্যেকে স্বীয় যামানায় সব চেয়ে বড় কুরআন ও হাদীস বিশারদ ও ফকীহ ছিলেন তাদের সকলের মতে তারাবীহ নামায ২০ রাকা‘আত, ৮ রাকা‘আত নয়। (আলমাবসূত পৃঃ ২/১৯৬, ই‘লাউস সুনান পৃঃ ৭/৬৯/৭১, আত্তামহীদ পৃঃ ৩/৫১৮, আলমুদাউওয়ানাতুল কুবরা পৃঃ ১/২৮৭, শরহুস্ সুন্নাহ পৃঃ ২/৫১১, মুগনী পৃঃ ২/৬০৪)

আট রাকা‘আত তারাবীহ নামায পড়া রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমল ও সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-এর ইজমা পরিপন্থী এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলের বিপরীত, অথচ নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণের জন্য তাকীদ করে গেছেন। (আবু দাউদ হাদীস নং ৪৬০৭, তিরমিযী হাদীস নং ২৬৭৬, ইবনে মাজাহ হাদীস নং ৪২-৪৩)

আট রাকা‘আত নামাযের হাদীসটি ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিমসহ অন্যান্য মুহাদ্দেসীনে কিরামের মতে একান্তভাবে তাহাজ্জুদের জন্য প্রযোজ্য। কোন অবস্থায় তা তারাবীহ নামাযের জন্য প্রযোজ্য নয়, এ জন্য তাঁরা এ হাদীসটি তাদের কিতাবে তাহাজ্জুদের অধ্যায় এনেছেন, তারাবীহ অধ্যায়ে তারাবীহ নামাযের রাকা‘আতের সংখ্যা প্রমাণের জন্য আনেননি। তাছাড়া উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীসটি এমন এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তর যার ধারণা ছিল নবী ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে অন্য মাসের তুলনায় তাহাজ্জুদ নামায অনেক বেশি পড়তেন, তার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, “নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানে ও রমাযানের বাইরে অন্যান্য মাসে আট রাকাআতের বেশী তাহাজ্জুদ নামায পড়তেন না।”

এখানে তিনি এমন নামাযের কথা আলোচনা করেছেন যা রমাযান শরীফে এবং রমাযান ছাড়া অন্য মাসেও পড়া যায়। আর তারাবীহ নামায রমাযান ছাড়া অন্য মাসে পড়া যায় না। কাজেই এ হাদীস দ্বারা কস্মিনকালেও তিনি তারাবীহ নামায ৮ রাকা‘আত বুঝাননি। বরং তাহাজ্জুদের নামায ৮ রাকা‘আত বুঝিয়েছেন। যা রমাযান ও রমাযানের বাইরেও পড়া যায়।

অত্যন্ত দুঃখজনক যে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কতক লোক যারা হাদীসের মর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ তারা এ হাদীসের দ্বারা তারাবীহ নামায ৮ রাকা‘আত প্রমাণ করে, যা নিতান্তই বোকামী। (বুখারী পৃঃ হাদীস নং ১১৪৭, বুখারী হাদীস নং ২০১৩)

তারাবীহ নামায মাত্র ৮ রাকা‘আত মনে করে পড়লে তা একাধারে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আমল খুলাফায়ে রাশেদীন এর আমল এবং সাহাবায়ে কিরাম রাযি. এর ইজমা বা ঐক্যমতের পরিপন্থী হওয়ায় জঘন্য বিদ‘আত এবং মনগড়া ইবাদত হবে। যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস অনুযায়ী গোমরাহী এবং জাহান্নামের আমল। এর থেকে বেঁচে থাকা সকল মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব। (বুখারী হাদীস নং ২৬৯৭, মুসলিম হাদীস নং ১৭১৮, আবু দাউদ হাদীস নং ৪৬০৬, ইবনে মাজাহ হাদীস নং ১৪)

তারাবীহ নামাযে বিতর সহ ৪ রাকা‘আত পর পর ৫ টি বিরতি। (বাইহাকী হাদীস নং ৪৬২১, হিদায়া পৃঃ১/১৫০, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া পৃঃ ১/৬৫৪)

তারাবীহা অর্থ বিশ্রাম করা, তার বহুবচন তারাবীহ। শব্দটি বহু বচন হওয়াটা দলীল যে এ নামাযে দু’এর অধিক বিরতি বিশ্রাম হওয়া জরুরী। তারাবীহ ৮ রাকা‘আত হলে তা কখনো সম্ভব হবে না।

তারাবীহ সহ সকল প্রকার নামাযে তাজবীদের সাথে তিলাওয়াত করা জরুরী। তাজবীদ বিহীন অস্পষ্ট অতি দ্রুত তিলাওয়াত শরী‘আতে নিষেধ। (সূরায়ে মযযাম্মিল ৪ তাফসীরে মাজহারী পৃঃ৯/১০, তালীফাতে রশীদিয়া পৃঃ২৬৯)

  • খতমে তারাবীহ নামাযের পারিশ্রমিক দেয়া ও নেয়া উভয়টা নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হাদীস নং ৭৭৩৮, ৭৭৪২, ফাতাওয়ায়ে শামী পৃঃ ৫/৫৬, ইমদাদুল মুফতীন পৃঃ ৩১৫, আহসানুল ফতওয়া ৩/৫১২, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলূম ৪/২৭৩)

জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া থেকে সুন্নাত তরীকায় তারাবীহ পড়ার জন্য হাফেয সাহেব নেয়ার শর্তাবলীঃ

১. হাফেয সাহেব ও তারাবীহ কর্তৃপক্ষ পরিস্কার ভাবে তারাবীহ নামাযের বিনিময় লেন-দেন না করার ব্যাপারে একমত হতে হবে।

২. তারাবীহতে খতমের সময় টাকা-পয়সা বা অন্য কোন প্রকার হাদিয়া, সম্মিলিত কালেকশনের কিংবা মসজিদ ফান্ডের টাকা ইত্যাদি কোন অবস্থাতেই হাফেয সাহেবকে দেয়া যাবে না, আর হাফেয সাহেবও নিবেন না। কেননা এটা শরী‘আতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়িয ও গুনাহের কাজ।

৩. হাফেয সাহেবকে দ্রুত পড়তে বাধ্য করা যাবে না, কেননা এভাবে কুরআন তিলাওয়াতে গুনাহ হয়। হাফেয সাহেব তারাবীহতে হদর অর্থাৎ, সহীহ শুদ্ধ করে মধ্যম গতিতে পড়বেন। তারাবীহতে লুকমা দেয়া হলে হাফেয সাহেব হা গ্রহণ করবেন, লুকমা গ্রহণে নামাযের কোন ক্ষতি হয় না।

৪. প্রতি চার রাকা‘আতের শেষে ‘সুবহানাল্লাহিল মুলকি’ পড়া অথবা সম্মিলিত মুনাজাত করা হাদীসে প্রমাণিত নেই, এর জন্য হাফেয সাহেবকে হুকুম করা যাবে না। বরং সে সময় যে কোন দু‘আ বা যিকির করা যেতে পারে। তেমনি ভাবে “আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাহ” তারাবীহ নামায শেষে গুরুত্ব সহকারে পড়া হয়, অথচ এভাবে পড়াও হাদীসে প্রমাণিত নেই। সুতরাং এর জন্যও হাফেয সাহেবদেরকে হুকুম করা যাবে না।

৫. তারাবীহ নামাযের মাঝে হাফেয ইমাম বদল যে কোন চার রাকা‘আতের পরে হওয়া উত্তম। দশ রাকা‘আতের মাথায় না করা চাই।

৬. হাফেয সাহেবদের মাধ্যমে তাহাজ্জুদের জামা‘আত বা কিয়ামুল লাইল এর জামা‘আত (তিন জনের বেশী মুসল্লী দ্বারা) চালু করা যাবে না। কারণ এটা না জায়িয ।

৭. হাফেয সাহেবদের মাধ্যমে প্রতিদিন স্বল্প সময়ের জন্য সুন্নাতের তা‘লীম ও নামাযের আমলী মশক্বের ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়।

৮. হাফেয সাহেবদের রমযানের খানার ইন্তেযাম করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে থাকবে।

৯. প্রতিদিন যাতায়াত করলে তার খরচ এবং তারাবীহ খতম শেষে হাফেয সাহেব নিজ বাড়িতে পৌঁছার খরচ কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে।

১০. খতমের সময় ছাড়া অন্য কোন সময় কেউ যদি নিজ উদ্যোগে হাফেয সাহেবের মুহাব্বতে ব্যক্তিগত ভাবে হাদিয়া পেশ করেন তাহলে শরিআতে তার অনুমতি আছে এবং এটা আলেম-উলামা ও তালেবে ইলমদের খেদমতের অন্তর্ভুক্ত, যার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কারীমের তৃতীয় পারায় সূরা বাকারায় ২৭৩ নং আয়াতে উৎসাহিত করেছেন। তবে এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার, কেউ করতে চাইলে করতে পারেন।

তারাবীহ এর বিনিময় গ্রহণের শরয়ী বিধান

তারাবীহ এর নামাযে ইমামতের বিনিময় আদান-প্রদান না-জায়িয হওয়া নির্ভরযোগ্য সকল ফিকাহবিদদেরে সর্বসম্মত মত। অতীতের কোন ফক্বীহ এ ব্যাপারে দ্বিমত করেননি। এতদসত্বেও বর্তমানে কেউ কেউ নিজস্ব মতকে শরী‘আতের মত ও ফিক্বাহবিদদের মত হিসাবে প্রচার করে তারাবীহ এর উজরতকে বৈধ বলার প্রয়াস চালাচ্ছেন। এ প্রেক্ষিতে সমকালীন বিশিষ্ট মুফতিয়ানে কিরামের ফাতাওয়া নিম্নে তুলে ধরা হলঃ

ফাতাওয়া বিভাগ, জামি‘আ রাহমানিয়া, ঢাকা।

ইবাদত বন্দেগী হিসাবে আমরা যা পালন করে থাকি, সাধারণত তা তিন প্রকার (ক) মাকাসিদ তথা খালেস ও মূল ইবাদাতঃ- যেমন নামায, রোযা, হজ্জ, সাওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির আযকার ও দু‘আ দুরূদ ইত্যাদি (খ) ওয়াসাইল তথা সহায়ক ইবাদাতঃ- যেমন ইমামত, ইকামত, দীনী শিক্ষাদান ও ওয়াজ নসীহত ইত্যাদি। (গ) রুক্বইয়াত তথা বালা মুসীবত থেকে পরিত্রাণ, রোগ মুক্তি, ব্যবসায় উন্নতি এ জাতীয় দুনিয়াবি কোন উদ্দেশ্যে বৈধ দু‘আ, খতম, ঝাড় ফুঁক, তাবীয কবয ইত্যাদি।

প্রথম প্রকার তথা মাকাসিদ জাতীয় ইবাদত করে বিনিময় নেয়া-দেয়া সম্পূর্ণ ও সর্বসম্মতভাবে হারাম। এ ব্যাপারে কোন কালেও কোন মাযহাবের কোন নির্ভরযোগ্য আলেম ফক্বীহ দ্বিমত পোষণ করেননি। পক্ষান্তরে তৃতীয় প্রকার আমলের বিনিময় গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হালাল। শুরু থেকে অদ্যাবধি এ ব্যাপারে কোন মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কোন মুজতাহিদ ফক্বীহ দ্বিমত পোষণ করেননি। (রদ্দুল মুহতার ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৫৫,৫৮ পৃষ্ঠা, আল মুদওয়ানাতুল কুবরা ৩য় খন্ডঃ ৪৩১ পৃষ্ঠা, ফাতওয়া রশীদিয়া-৪১৭পৃষ্ঠা।)

আর দ্বিতীয় প্রকার তথা আযান, ইমামত, কুরআন-হাদীস তথা দীনী তা‘লীম এ জাতীয় পর্যায়ের ইবাদাতের বিনিময় গ্রহণ ও প্রদান অন্যান্য মাযহাবে জায়িয থাকলেও হানাফী মাযহাবের পূর্ববর্তী উলামায়ে কিরামের মতে নাজায়িয। কিন্তু উলামায়ে মুতাআখখিরীন (পরবর্তী যুগের আলেমগণ) শরী‘আতের বিশেষ উসূল তথা মূলনীতির ভিত্তিতে বিশেষ কতক ইবাদাতের বিনিময় গ্রহণ ও প্রদানকে বৈধ বলেছেন। সে উসূল হলো এ শ্রেণীর যে সকল ইবাদাত ফরয ওয়াজিব ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ এবং শি‘আরে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত অথবা দীনের স্থায়িত্ব তার উপর নির্ভরশীল বিধায় বিনিময়ের আদান-প্রদান বৈধ না হলে এ যুগে এসকল ইবাদত কায়েম রাখা সম্ভব হবে না, তাই দীনের স্থায়িত্বের প্রয়োজনেই তা জায়িয। ফিক্বাহবিদগণ সে সকল ইবাদতকে চিহ্নিতও করেছেন আর তা হলোঃ ফরয ওয়াজিব নামাযের ইমামতি, আযান-ইকামত, দীনি শিক্ষাদান ইত্যাদি। (সূত্রঃ রদ্দুল মুহতার-৬ষ্ঠ খন্ডঃ ৬৯০, ৬৯১ পৃষ্ঠা। ইমদাদুল ফাতাওয়া ১ম খণ্ড ৪৭৬ পৃষ্ঠা ইমাদদুল মুফতীন ৩১৩ পৃষ্ঠা, ইমদাদুল আহকাম-৩য় খণ্ড ৫২৭ পৃষ্ঠা)

পক্ষান্তরে এ দ্বিতীয় প্রকারের যে সকল ইবাদাত ফরয ওয়াজিব নয় এবং শি‘আরে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত নয়, দীনের স্থায়িত্বও তার উপর নির্ভরশীল নয় যেমনঃ তারাবীহ এবং সওয়াব রেসানীর উদ্দেশ্যে কুরআন খতম করা। এ সকল ইবাদাতের বিনিময় গ্রহণ ও বিনিময় প্রদানকে কোন আলেম জায়িয বলেননি বরং নির্ভরযোগ্য সকল ফিক্বাহবিদ লেনদেনকে হারাম বলেছেন। (ফাতওয়া রশীদিয়া ৩২৪পৃঃ, ইমদাদুল ফাতাওয়া ১ম খণ্ড ৪৮৪ পৃষ্ঠা, ইমদাদুল মুফতীন ৩১৫ পৃষ্ঠা, ইমদাদুল আহকাম ৩য় খণ্ড ৫১৭ পৃষ্ঠা। আহসানুল ফাতওয়া ৩য় খণ্ড ৫১৪ পৃষ্ঠা, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ৮ম খণ্ড ২৪৭ পৃষ্ঠা, ফাতওয়া দারুল উলুম ৪র্থ খণ্ড ২৭৩ পৃষ্ঠা।)

সম্প্রতি দৈনিক ইনকিলাবের “ইসলামী জীবন পাতায়” একটি প্রশ্নের জবাবে দুজন আলেম তারাবীহের বিনিময়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। তন্মধ্যে একজন আলেম তার বর্ণনার এক পর্যায়ে লিখেছেন “যুগের সকল ইমাম মুজতাহিদ ঐক্যবদ্ধভাবে রায় দিয়েছেন যে পবিত্র কুরআন সুন্নাহর হেফাজত তথা তালীমে ইলমে দীন, ওয়াজ নসীহত, আযান ইকামত এক কথায় যাবতীয় ধর্মীয় আমলগুলোর উপর হাদিয়া বা উজরত যে কোন নামে দেয়া নেয়ায় কোন দোষ নেই বরং উচিত।” এ উক্তির শেষ বাক্যে তিনি ইবাদাতের সব শ্রেণীকে একাকার করে ফেলেছেন। যার মর্ম দাঁড়ায় যে অন্যের জন্য নামায পড়ে, রোযা রেখে বিনিময় গ্রহণ করা যাবে বলে যুগের সকল ইমাম মুজতাহিদ ও আলেম ঐক্যবদ্ধ রায় দিয়েছেন। এমন কথা কোন মূর্খ বা দীনের ব্যাপারে স্পষ্ট খেয়ানতকারী ছাড়া বলতে পারে না। তিনি প্রমাণ করতে গিয়ে যে সকল কিতাবের বরাত দিয়েছেন, সেগুলোতে এ জাতীয় ফতোয়ার কোন উল্লেখ নেই। আর তারাবীহের বিনিময় আদান-প্রদান বৈধতার কথা থাকার তো প্রশ্নই আসেনা। আর অপর আলেম পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযান ইমামতের উপর কিয়াস করে তারাবীহের ইমামতকেও জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং এর বিনিময়কে জায়িয বলেছেন। অথচ তারাবীহের নামায একদিকে সুন্নাতে মুআক্কাদাহ অপরদিকে জামা‘আত সহকারে খতম তারাবীহের পরিবর্তে সূরা তারাবীহ পড়ার অবকাশও রয়েছে। (রদ্দুল মুহতার ২য় খন্ডঃ ৪৫পৃঃ রদ্দুল মুহতার ২য় খণ্ড ৪৭ পৃঃ)

পক্ষান্তরে পাঁচ ওয়াক্তের জামা‘আত মুসাফির ও মাযূর লোক ছাড়া সকল সাবালক পুরুষের জন্য বিশেষ ওযর না থাকলে মসজিদে গিয়ে আদায় করা ওয়াজিব। তাহলে উভয়টা এক রকম কি করে হলো? এ ছাড়া হাফেযগণ নিজ নিজ হিফয ঠিক রাখার তাগিদেই তারাবীহ পড়ানোর সুযোগ খুঁজতে থাকেন। এমতাবস্থায় বিনিময় না দিলে হাফেয পাওয়া যাবে না, বা খুব কম পাওয়া যাবে এ ধারনা তাঁর মধ্যে কি করে জন্ম হলো? তদুপুরি জনাব মুফতি সাহেব তারাবীর বিনিময় বৈধতায় নিজ মত উল্লেখ করার পর এ ব্যাপারে উলামায়ে মুতাআখখিরীনদের ফাতাওয়া নিম্নরূপ বলে যে বরাত দিয়েছেন তাতে সকলেই সর্বসম্মতভাবে এর বিনিময় লেন-দেনকে সম্পূর্ণ হারাম বলেছেন। তাঁরা পরিস্কার ভাবে বলেছেন তারাবীহের নামায সুন্নাত আর এর বিনিময় লেন-দেন হারাম। তাই সুন্নাত কায়েমের জন্য হারাম কাজের অনুমতি নেই। (ইমদাদুল ফাতওয়া ১ম খণ্ড ৪৮৪ পৃষ্ঠা ইমদাদুল মুফতীন ৩১৫ পৃষ্ঠা)

আর তৎপূর্ববর্তীগণ সম্ভবত তারাবীহ এর বিনিময় নেয়ার কল্পনা করেননি। যার কারণে তাদের কিতাবাদীতে এতদসংক্রান্ত কোন আলোচনাই পাওয়া যায় না। তাছাড়া আলোচ্য মুফতী সাহেব তাঁর বর্ণনায় এক পর্যায়ে লিখেছেন, ‘তারাবীহের নামাযের ইমামতি অন্য নামাযের ইমামতি হতে পৃথক নহে।’ (হেদায়া প্রথম খণ্ড ৭৮ পৃষ্ঠা)

এটা পত্রিকার ছাপার ভুল না হয়ে থাকলে ইলমী বিষয়ে চরম খেয়ানত বিবেচিত হবে। কেননা হেদায়া গ্রন্থের কোথাও তারাবীহের জামা‘আতের ইমামতীকে অন্য নামাযের ইমামতীর ন্যায় বলা হয়নি, এটা নিছক মুফতী সাহেবের নিজস্ব উক্তি, যার রেফারেন্স কোন ফাতাওয়ার কিতাবে নেই।

সারকথা, ঢালাওভাবে সকল ধর্মীয় আমলের বিনিময় আদান-প্রদানের কথা যেমন ঠিক নয়, তেমনিভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযান-ইমামত যেমন জরুরত, তারাবীহের ইমামত ঠিক সে রকম জরুরত সে কথাও কোথাও নেই। বরং আকাবির সাহাবাগণ তো তারাবীহ নামায নিজ নিজ বাড়িতে পড়তেন। এ কারণে বর্তমান ও নিকট অতীতের সকল নির্ভরযোগ্য ফাতাওয়া অনুযায়ী তারাবীহ-এর ইমামতী করে বিনিময় দেয়া ও নেয়া বৈধ নয়। আর হাদিয়ার সাথে তারাবীহ এর ইমামতের কোন সম্পৃক্ত নেই। কাজেই হাদিয়ার প্রশ্ন এখানে অবান্তর। খতমের সময় ব্যতীত অন্য সময় যদি হাফেজ সাহেবের মুহাব্বতে ব্যক্তিগতভাবে কেউ হাদিয়া পেশ করেন তাহলে এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিষ এবং তা শরী‘আতেও অনুমোদিত। (ফাতাওয়া রশীদিয়া ৩২৫ পৃষ্ঠা, ইমদাদুল মুফতীন ৩১৪ পৃষ্ঠা, ফাইজুল বারী ৩য় খন্ডঃ ১৮১ পৃষ্ঠা)

সুতরাং হাফেজদের নিজেদের হারাম রিযিক থেকে পরহেজ করা ফরয এবং মুসল্লীদেরও উচিত ক্বারী, হাফেজ আলেমদেরকে সহীহ পন্থায় হাদিয়া পেশ করা। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।